গ্রিন টি বা সবুজ চা পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবে পরিচিত।
প্রাচীনকাল থেকে এটি চীনা ও জাপানি সংস্কৃতিতে স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য ব্যবহৃত
হয়ে আসছে। গ্রিন টিতে প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পলিফেনল এবং বিভিন্ন জীবকৃত
উপাদান থাকে, যা দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং মস্তিষ্কের
কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করে।
আপনি কি গ্রিন টি খেতে চাচ্ছেন কিন্ত কোন নিয়মে খাবেন , আপনার শরীরের জন্য
খাওয়া উচিত কী না বা কী পরিমাণে খাবেন অথবা গ্রিন টি-এর উপকারিতা ও
অপকারিতা সর্ম্পকে জানেন না তবে আজকের এই আরটিকাল আপনার জন্য সম্পূর্ন আরটিকাল
মনোযোগ দিয়ে পড়ার মাধ্যমে গ্রিন টি সর্ম্পকিত সকল প্রশ্নের উত্তর পাবেন।
পেজ সুচিপত্রঃ গ্রিন টি-এর উপকারিতা ও অপকারিতা পোস্টে আমরা যা যা জানতে
পাড়বো
গ্রিন টি একটি জনপ্রিয় স্বাস্থ্যকর পানীয়, যা প্রাচীনকাল থেকেই চীনা ও জাপানি
সংস্কৃতিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এতে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, বিশেষ
করে ক্যাটেচিন, যা শরীরকে বিভিন্ন রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করে। নিয়মিত
গ্রিন টি পান করলে শরীরের মেটাবলিজম বাড়ে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য
করে। এটি হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সহায়তা করে এবং
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। এছাড়া গ্রিন টি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়,
মনোযোগ বৃদ্ধি করে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। ত্বক ও চুলের জন্যও গ্রিন
টি উপকারী, কারণ এটি ত্বককে উজ্জ্বল রাখে এবং বার্ধক্যের লক্ষণ কমাতে সাহায্য
করে।
গ্রিন টি-এর উপকারিতা ও অপকারিতা দুই রয়েছে অতিরিক্ত গ্রিন টি পান করলে কিছু
অপকারিতাও দেখা দিতে পারে। এতে থাকা ক্যাফেইন অনিদ্রা, মাথাব্যথা ও অস্থিরতা
সৃষ্টি করতে পারে। খালি পেটে গ্রিন টি পান করলে গ্যাস্ট্রিক বা পেটের সমস্যা
হতে পারে। অতিরিক্ত গ্রহণ শরীরে আয়রনের শোষণ কমিয়ে দিতে পারে, যা
রক্তস্বল্পতার কারণ হতে পারে। গর্ভবতী নারী ও বিশেষ কিছু রোগে আক্রান্ত
ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে গ্রিন টি পান করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তাই
উপকার পেতে হলে সঠিক পরিমাণ ও নিয়ম মেনে গ্রিন টি পান করাই সবচেয়ে উত্তম।
গ্রিন টি হলো ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস নামক উদ্ভিদের পাতা থেকে প্রস্তুত এক ধরনের
ভেষজ চা। এই চা তৈরির সময় পাতাগুলোকে খুব কম প্রক্রিয়াজাত করা হয়, যার ফলে
এতে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ন থাকে। গ্রিন টি
সাধারণত সবুজাভ রঙের হয় এবং এর স্বাদ হালকা তিক্ত হলেও সতেজ অনুভূতি দেয়। এতে
ক্যাফেইন কম পরিমাণে থাকলেও শরীর ও মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে এটি কার্যকর
ভূমিকা পালন করে। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে গ্রিন টি বর্তমানে একটি
জনপ্রিয় পানীয়।
গ্রিন টি-এর উৎপত্তি প্রাচীন চীনে। ইতিহাস অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে
চীনের সম্রাট শেন নং প্রথম গ্রিন টি-এর ব্যবহার শুরু করেন। ধীরে ধীরে এটি চীনা
সমাজে ঔষধি পানীয় হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরবর্তীতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের
মাধ্যমে গ্রিন টি জাপানসহ অন্যান্য এশীয় দেশে ছড়িয়ে পড়ে। জাপানে গ্রিন টি
শুধু পানীয় নয়, বরং সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে
ওঠে।
পরবর্তীকালে গ্রিন টি ইউরোপ ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশেও জনপ্রিয়তা পায়। আধুনিক
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এর স্বাস্থ্য উপকারিতা প্রমাণিত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে এর
চাহিদা বেড়েছে। বর্তমানে চীন, জাপান, ভারত ও শ্রীলঙ্কা গ্রিন টি উৎপাদনে
অগ্রগণ্য দেশ হিসেবে পরিচিত
গ্রিন টি-এর পুষ্টিগুণ
গ্রিন টি একটি প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর পানীয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত
উপকারী। এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, বিশেষ করে ক্যাটেচিন ও
পলিফেনল, যা শরীরের ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল ধ্বংস করতে সাহায্য করে। এই
উপাদানগুলো কোষের ক্ষয় রোধ করে এবং বার্ধক্য প্রক্রিয়া ধীর করতে ভূমিকা
রাখে। এছাড়া গ্রিন টি-তে ভিটামিন সি, ভিটামিন বি২ (রিবোফ্লাভিন) ও ভিটামিন
ই-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিনও পাওয়া যায়, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
বাড়ায়।
গ্রিন টি-তে অল্প মাত্রায় ক্যাফেইন থাকলেও এতে থাকা এল-থিয়ানিন নামক একটি
অ্যামিনো অ্যাসিড মস্তিষ্ককে শান্ত রাখে এবং মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে।
এই দুটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করে মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
পাশাপাশি গ্রিন টি-তে থাকা খনিজ উপাদান যেমন পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও
ম্যাঙ্গানিজ শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
গ্রিন টি ক্যালোরি কম হওয়ায় এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক একটি পানীয়। এতে
চর্বি গলাতে সহায়ক যৌগ রয়েছে, যা শরীরের মেটাবলিজম বাড়ায়। নিয়মিত ও
পরিমিত পরিমাণে গ্রিন টি পান করলে শরীর পায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি, পাশাপাশি
বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও কমে।
শরীরের ওজন কমাতে গ্রিন টি-এর ভূমিকা
বর্তমান সময়ে ওজন নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য বিষয়, আর এই
ক্ষেত্রে গ্রিন টি একটি কার্যকর প্রাকৃতিক সহায়ক হিসেবে পরিচিত। গ্রিন টি-তে
থাকা ক্যাটেচিন ও ইপিগ্যালোক্যাটেচিন গ্যালেট ( নামক শক্তিশালী
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের মেটাবলিজম বাড়াতে সাহায্য করে। মেটাবলিজম দ্রুত
হলে শরীর বেশি ক্যালোরি পোড়াতে পারে, যা ধীরে ধীরে ওজন কমাতে সহায়তা করে।
তাই নিয়মিত গ্রিন টি পান করলে শরীরের অতিরিক্ত চর্বি জমার প্রবণতা কমে।
গ্রিন টি শরীরের চর্বি পোড়ানোর প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে, বিশেষ করে পেট ও
কোমরের জমে থাকা ফ্যাট কমাতে সাহায্য করে। এতে থাকা অল্প পরিমাণ ক্যাফেইন
শরীরকে উদ্দীপিত করে এবং ব্যায়ামের সময় শক্তি বাড়ায়। ফলে হাঁটা, দৌড়ানো
বা শরীরচর্চার সময় বেশি ক্যালোরি খরচ হয়। এছাড়া গ্রিন টি ক্ষুধা
নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে, যার ফলে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের প্রবণতা কমে যায়।
তবে শুধু গ্রিন টি পান করলেই ওজন কমবে-এমন ধারণা সঠিক নয়। স্বাস্থ্যকর
খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়ামের সঙ্গে গ্রিন টি পান করলে ভালো ফল পাওয়া
যায়। দিনে ২-৩ কাপ গ্রিন টি ওজন কমানোর জন্য যথেষ্ট। অতিরিক্ত পান করলে
উপকারের পরিবর্তে শরীরের ক্ষতি হতে পারে। তাই সঠিক নিয়ম মেনে গ্রিন টি গ্রহণ
করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে গ্রিন টি
হৃদরোগ বর্তমান সময়ের একটি মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা, আর এটি প্রতিরোধে
গ্রিন টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গ্রিন টি-তে থাকা শক্তিশালী
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, বিশেষ করে ক্যাটেচিন, রক্তনালীর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে
সহায়তা করে। এই উপাদানগুলো রক্তনালীর ভেতরে চর্বি জমা হওয়া কমায় যার ফলে
রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে এবং হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ কমে।
গ্রিন টি নিয়মিত পান করলে রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা এলডিএল কমতে সাহায্য
করে এবং ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিএল বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এর ফলে
হৃদরোগ, স্ট্রোক ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এছাড়া
গ্রিন টি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে, যা হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখার
জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়াও গ্রিন টি প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে, যা হৃদরোগের অন্যতম কারণ হিসেবে
বিবেচিত। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে, ফলে
ডায়াবেটিসজনিত হৃদরোগের ঝুঁকিও কমে। তবে হৃদরোগ প্রতিরোধে গ্রিন টি একমাত্র
সমাধান নয়। সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সঙ্গে
দিনে ১-২ কাপ গ্রিন টি পান করলে হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে সহায়ক হয়।
ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
ও জীবনযাপন অত্যন্ত জরুরি। এই ক্ষেত্রে গ্রিন টি একটি উপকারী প্রাকৃতিক পানীয়
হিসেবে পরিচিত। গ্রিন টি-তে থাকা ক্যাটেচিন ও পলিফেনল রক্তে শর্করার মাত্রা
নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এসব উপাদান ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে,
যার ফলে শরীর সহজে গ্লুকোজ ব্যবহার করতে পারে এবং রক্তে অতিরিক্ত শর্করা জমা হয়
না।
গ্রিন টি নিয়মিত পান করলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমতে পারে। এটি
কার্বোহাইড্রেট ভাঙার প্রক্রিয়াকে ধীর করে, ফলে খাবার গ্রহণের পর রক্তে শর্করার
মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। এছাড়া গ্রিন টি শরীরের ওজন
নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অতিরিক্ত ওজন ডায়াবেটিসকে আরও জটিল করে তোলে, আর গ্রিন টি সেই ঝুঁকি কমাতে
সাহায্য করে।
এছাড়াও গ্রিন টি ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা যেমন হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি
কমাতে ভূমিকা রাখে। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের প্রদাহ কমায় এবং
রক্তনালীর স্বাস্থ্য ভালো রাখে। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের গ্রিন টি পান করার আগে
চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দিনে ১-২ কাপ চিনি ছাড়া গ্রিন টি পান করাই
সবচেয়ে নিরাপদ ও উপকারী।
হজমশক্তি উন্নত করতে গ্রিন টি
গ্রিন টি শুধু শরীরের ওজন বা হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে নয়, বরং হজমশক্তি উন্নত করতেও
কার্যকর। গ্রিন টি-তে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রাকৃতিক যৌগগুলি হজম
প্রক্রিয়াকে সহজ করে। খাবারের পর এটি পাকস্থলীতে গ্যাস ও অস্বস্তি কমাতে
সাহায্য করে এবং খাবার দ্রুত ভাঙতে সহায়ক। ফলে পেট ভারী লাগার সমস্যা কমে এবং
হজম প্রক্রিয়া সুস্থ থাকে।
গ্রিন টি-তে থাকা ক্যাটেচিন এবং অন্যান্য ফাইটোকেমিক্যালস অন্ত্রের
ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি ভালো ব্যাকটেরিয়ার
বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি সীমিত করে। হজম
প্রক্রিয়া ঠিক থাকলে খাবার থেকে পুষ্টি গ্রহণও বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও গ্রিন টি
অল্প মাত্রায় ক্যাফেইন থাকার কারণে পেটের মসৃণ পেশীকে সক্রিয় রাখে, যা খাদ্য
সহজে চলাচল করতে সাহায্য করে।
তবে খালি পেটে গ্রিন টি পান করা কখনো কখনো গ্যাস বা পেটের অস্বস্তি সৃষ্টি করতে
পারে। তাই খাবারের পর বা সঠিক সময়ে গ্রিন টি পান করা উত্তম। দিনে ১-২ কাপ
নিয়মিত গ্রিন টি হজমশক্তি উন্নত করার জন্য যথেষ্ট। এটি নিয়মিত খেলে পেট
স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং হজমজনিত সমস্যা অনেকাংশে কমে।
ত্বক ও চুলের জন্য গ্রিন টি-এর উপকারিতা
গ্রিন টি শুধুমাত্র শরীরের অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যের জন্য নয়, ত্বক ও চুলের যত্নেও
খুবই উপকারী। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যেমন ক্যাটেচিন এবং ভিটামিন সি ত্বকের
কোষকে ক্ষয়রোধ করতে সাহায্য করে। নিয়মিত গ্রিন টি পান করলে ত্বকের উজ্জ্বলতা
বৃদ্ধি পায়, এবং এটি বার্ধক্যের লক্ষণ যেমন ছোট ছোট বলিরেখা ও ফাইন লাইন কমাতে
সহায়ক। এছাড়াও গ্রিন টি-তে থাকা অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্য ত্বকের প্রদাহ
ও লালচে ভাব কমায়, ফলে ত্বক থাকে সুস্থ ও মসৃণ।
চুলের জন্যও গ্রিন টি বেশ উপকারী। এতে থাকা ক্যাটেচিন ও অন্যান্য
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট চুলের রুটকে শক্তিশালী করে এবং চুল পড়া কমাতে সাহায্য করে।
নিয়মিত গ্রিন টি পান করলে স্ক্যাল্পের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়, যা চুলের
বৃদ্ধি উত্সাহিত করে। এছাড়াও এটি খুশকি ও চুলের শুষ্কতা কমাতে সহায়ক, ফলে চুল
থাকে কোমল ও স্বাস্থ্যসম্মত।
গ্রিন টি ব্যবহার শুধু পানির মাধ্যমে নয়, ত্বক বা চুলের প্যাক হিসেবেও ব্যবহার
করা যায়। তবে সবকিছুতেই পরিমিতি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। দিনে ১-২ কাপ গ্রিন টি
পান এবং চুল বা ত্বকে সপ্তাহে একবার গ্রিন টি মাস্ক ব্যবহার করলে সর্বোত্তম ফল
পাওয়া যায়। এতে ত্বক উজ্জ্বল এবং চুল শক্তিশালী থাকে।
মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যে গ্রিন টি-এর প্রভাব
গ্রিন টি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি প্রাকৃতিক পানীয়।
এতে থাকা ক্যাফেইন ও এল-থিয়ানিন মস্তিষ্ককে সতেজ ও সজাগ রাখতে সাহায্য করে।
ক্যাফেইন অল্প মাত্রায় মস্তিষ্ককে উদ্দীপিত করে এবং মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও
শেখার ক্ষমতা বাড়ায়। অন্যদিকে এল-থিয়ানিন একটি অ্যামিনো অ্যাসিড, যা মানসিক
চাপ কমাতে ও মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। এই দুই উপাদানের সংমিশ্রণ মানসিক
কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ঘুমের মানও উন্নত করে।
গ্রিন টি নিয়মিত পান করলে মস্তিষ্কের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। বিভিন্ন
গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিন টি নিয়মিত পান করা ব্যক্তিরা আলঝেইমার এবং
পারকিনসনের মতো স্নায়ুবিক রোগের ঝুঁকি কম থাকে। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
নিউরনকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে এবং মস্তিষ্কের কোষ সুস্থ রাখে। ফলে বয়স বাড়লেও
মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধীরগতি কমে।
এছাড়াও গ্রিন টি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতেও ভূমিকা রাখে। এটি উদ্বেগ ও
বিষণ্নতা কমাতে সাহায্য করে এবং মনকে শান্ত রাখে। নিয়মিত ১-২ কাপ গ্রিন টি পান
করলে দৈনন্দিন চাপ ও স্ট্রেসের প্রভাব কমানো সম্ভব। তবে অতিরিক্ত গ্রিন টি পান
করলে উদ্বেগ বা অনিদ্রা দেখা দিতে পারে, তাই পরিমিতভাবে গ্রহণ করাই উত্তম।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গ্রিন টি
গ্রিন টি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর একটি
পানীয়। এতে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, বিশেষ করে ক্যাটেচিন, যা শরীরের
কোষকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল থেকে রক্ষা করে। ফ্রি র্যাডিক্যাল দেহের কোষ
নষ্ট করে রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে, তাই এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখাই স্বাস্থ্য বজায়
রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত গ্রিন টি পান করলে শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ
ব্যবস্থা শক্তিশালী হয় এবং সংক্রমণ ও ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ হয়।
গ্রিন টি-তে থাকা ভিটামিন সি ও পলিফেনল শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় রাখে।
এটি সাদা রক্তকণিকা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে, যা জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার
বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও গ্রিন টি প্রদাহ
কমাতে সাহায্য করে, যা শরীরকে সংক্রমণ থেকে দ্রুত সুস্থ হতে সহায়ক করে।
তবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গ্রিন টি একমাত্র সমাধান নয়। স্বাস্থ্যকর
খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত ব্যায়ামের সঙ্গে গ্রিন টি নিয়মিত পান
করা সবচেয়ে কার্যকর। দিনে ১-২ কাপ গ্রিন টি পান করলে শরীরের ইমিউন সিস্টেম
সুস্থ থাকে এবং বিভিন্ন সাধারণ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
গ্রিন টি সাধারণভাবে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হলেও, অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে
কিছু সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এতে থাকা ক্যাফেইন অতিরিক্ত হলে ঘুমের সমস্যা,
অনিদ্রা, মাথাব্যথা এবং অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত
ক্যাফেইন হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি করতে পারে এবং নার্ভাসনেস বা উদ্বেগের মাত্রা বাড়াতে
পারে। তাই প্রতিদিনের সীমার মধ্যে গ্রিন টি পান করাই উত্তম।
অতিরিক্ত গ্রিন টি খালি পেটে পান করলে পাকস্থলীর সমস্যা, গ্যাস্ট্রিক বা জ্বরের
মতো সমস্যা হতে পারে। এছাড়া এতে থাকা ট্যানিন খাদ্য থেকে আয়রনের শোষণ কমিয়ে
দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে গর্ভবতী
মহিলা বা শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গ্রিন টি গ্রহণে সতর্কতা জরুরি।
গ্রিন টি-এর অতিরিক্ত ব্যবহার কিডনি ও লিভারের উপরও চাপ ফেলতে পারে। দীর্ঘ সময়
ধরে দিনে অনেক কাপ গ্রিন টি পান করলে শরীরের প্রয়োজনীয় খনিজ ও ভিটামিনের
ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে। তাই সঠিক মাত্রায়, দিনে ১-২ কাপ গ্রিন টি পান করাই
সবচেয়ে নিরাপদ। স্বাস্থ্যকর ফলাফলের জন্য নিয়মিত পরিমাণ বজায় রাখা
গুরুত্বপূর্ণ।
কোন কোন মানুষের জন্য গ্রিন টি ক্ষতিকর হতে পারে
গ্রিন টি সাধারণভাবে সবার জন্য নিরাপদ হলেও, কিছু মানুষের জন্য এটি ক্ষতিকর
প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যারা অতিরিক্ত সংবেদনশীল ক্যাফেইনের প্রতি, তাদের
জন্য গ্রিন টি অতিরিক্ত উত্তেজনা, অনিদ্রা বা হৃদস্পন্দনের সমস্যা সৃষ্টি করতে
পারে। এমন ব্যক্তিরা যদি দিনে অনেক কাপ গ্রিন টি পান করেন, তাহলে শারীরিক
অস্বস্তি বা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
গর্ভবতী ও স্তন্যদানরত মহিলাদের জন্যও অতিরিক্ত গ্রিন টি ক্ষতিকর হতে পারে। এতে
থাকা ক্যাফেইন এবং অন্যান্য যৌগ শিশুর জন্য হানি বা মাতার দুধে প্রভাব ফেলতে
পারে। এছাড়া যাদের রক্তে আয়রন কম বা অ্যানিমিয়ার সমস্যা রয়েছে, তারা অতিরিক্ত
গ্রিন টি পান করলে শারীরিক সমস্যায় পড়তে পারেন। কারণ গ্রিন টি আয়রনের শোষণ
কমিয়ে দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি বাড়ায়।
এছাড়া যাদের কিডনি বা লিভারের সমস্যা আছে, তাদের জন্যও গ্রিন টি অতিরিক্ত
ক্ষতিকর হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত গ্রিন টি পান করলে শরীরের প্রয়োজনীয়
খনিজ ও ভিটামিনের ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে। তাই এই ধরনের মানুষের জন্য দিনে ১-২
কাপ সীমিত পরিমাণে গ্রিন টি গ্রহণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
সঠিক নিয়মে গ্রিন টি পান করার পরামর্শ
গ্রিন টি একটি স্বাস্থ্যকর পানীয় হলেও, সঠিক নিয়মে গ্রহণ না করলে তা ক্ষতিকর
প্রভাব ফেলতে পারে। সঠিক নিয়মে গ্রিন টি পান করলে এর সমস্ত উপকারিতা পাওয়া
যায়। প্রথমত, দিনে ১-২ কাপ গ্রিন টি যথেষ্ট। বেশি পরিমাণে পান করলে ঘুমের
সমস্যা, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি বা অনিদ্রার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই সঠিক
পরিমাণ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, গ্রিন টি খালি পেটে না খাওয়াই ভালো। খালি পেটে গ্রিন টি পান করলে
পেটে অস্বস্তি, গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটি হতে পারে। খাবারের পর বা মধ্যাহ্ন
বিরতির সময় গ্রিন টি পান করা উত্তম। এছাড়াও চিনি বা অতিরিক্ত মধু মেশানো
এড়ানো উচিত, কারণ এতে স্বাস্থ্যকর উপকারিতা কমে যায়।
তৃতীয়ত, বিশেষ কোনো রোগের উপস্থিতিতে বা গর্ভবতী মহিলাদের জন্য চিকিৎসকের
পরামর্শ নিয়ে গ্রিন টি গ্রহণ করা উচিত। রাতে গ্রিন টি পান করলে ঘুমের সমস্যা
হতে পারে, তাই সন্ধ্যার পর এড়ানো ভালো। নিয়মিত ও পরিমিতভাবে গ্রিন টি পান
করলে এটি শরীর, মস্তিষ্ক, ত্বক এবং চুলের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। সঠিক নিয়মে
গ্রহণ করলে গ্রিন টি থেকে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়া সম্ভব।
শেষ কথাঃ গ্রিন টি-এর উপকারিতা ও অপকারিতা
গ্রিন টি-এর উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে বলা যায়, এটি একটি প্রাকৃতিক পানীয় যা
নিয়মিত এবং সঠিক পরিমাণে গ্রহণ করলে শরীর, মস্তিষ্ক, ত্বক ও চুলের জন্য খুবই
উপকারী। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান শরীরকে রোগ
প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি
কমাতে এবং হজমশক্তি উন্নত করতে সহায়ক। এছাড়াও এটি মানসিক চাপ কমায়, মনোযোগ
বাড়ায় এবং ত্বক ও চুলকে সুস্থ ও উজ্জ্বল রাখে।
গ্রিন টি-এর উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও, অতিরিক্ত বা খালি পেটে গ্রহণ করলে কিছু
অপকারিতা দেখা দিতে পারে। এতে থাকা ক্যাফেইন অনিদ্রা, মাথাব্যথা, অস্থিরতা বা
হজমের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ কিছু মানুষের জন্য যেমন গর্ভবতী মহিলা,
অ্যানিমিয়ার রোগী বা কিডনি সমস্যাযুক্তদের অতিরিক্ত গ্রিন টি ক্ষতিকর হতে
পারে। তাই স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়ার জন্য দিনে ১-২ কাপ সীমিত পরিমাণে এবং
সঠিক নিয়মে গ্রিন টি পান করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর।
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url